রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১

আপনার আয়কর রিটার্ন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যঃ

 (ক) আয়কর রিটার্নঃ

আয়কর কর্তৃপক্ষের নিকট আয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্হাপন করার মাধ্যম হচ্ছে আয়কর রিটার্ন। আয়কর রিটার্ন ফরম এর কাঠামো আয়কর বিধি দ্বারা নির্দিষ্ট করা আছে। আয়কর আইন অনুযায়ী আয়কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়।

খ) আয়কর রিটার্ন দাখিল করা কাদের জন্য বাধ্যতামূলকঃ
কারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন তা দুই ভাবে চিহ্নিত করা যায়, যথাঃ-
(i) যাদের করযোগ্য আয় রয়েছে; এবং
(ii) যাদেরকে আবশ্যিকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
(i) করযোগ্য আয়ের ভিত্তিতে যাদেরকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে-
১. কোন ব্যক্তি করদাতার (Individual) আয় যদি বছরে ৩,০০,০০০/- টাকার বেশী হয় তবে তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
২. তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা, মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতার আয় যদি বছরে ৩,৫০,০০০/- টাকার বেশী হয় তবে তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
৩. প্রতিবন্ধী করদাতার আয় যদি বছরে ৪,৫০,০০০/- টাকার বেশী হয় তবে তাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
৪. গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার আয় যদি বছরে ৪,৭৫,০০০/- টাকার বেশী হয় তাহলে তাঁকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
(ii) যাদেরকে আবশ্যিকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে-
১. যিনি ১২ ডিজিটের টিআইএন গ্রহণ করেছেন;
২. করদাতার মোট আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে;
৩. আয় বছরের পূর্ববর্তী ৩ বছরের যে কোন বছর করদাতার কর নির্ধারণ হয়ে থাকে বা তার আয় করযোগ্য হয়ে থাকে;
৪. করদাতা যদি কোন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার employee হন;
৫. করদাতার যদি কোন ফার্মের অংশীদার হন;
৬. করদাতা যদি সরকার অথবা সরকারের কোন কর্তৃপক্ষ, কর্পোরেশন, সত্ত্বা বা ইউনিটের বা প্রচলিত কোন আইন, আদেশ বা দলিলের মাধ্যমে গঠিত কোন কর্পোরেশন, সত্ত্বা বা ইউনিটের কর্মচারী (employee) হয়ে আয় বছরের যে কোন পরিমাণ ১৬,০০০ টাকা বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ মূল বেতন আহরণ করে থাকেন;
৭. করদাতা যদি কোন ব্যবসায় বা পেশায় নির্বাহী বা ব্যবস্হাপনা পদে (যে নামেই অভিহিত হোক না হোক) বেতনভোগী কর্মী (employee) হন;
৮. করদাতার আয় কর অব্যাহতি প্রাপ্ত বা হ্রাসকৃত হারে করযোগ্য হয়ে থাকে;
৯. করদাতা যদি মোটর গাড়ীর মালিক হন (মোটর গাড়ী বলতে জীপ বা মাইক্রোবাসকেও বুঝাবে);
১০. করদাতা যদি কোন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ হতে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করে কোন ব্যবসা বা পেশা পরিচালনা;
১১. করদাতার যদি মূল্য সংযোজন কর আইনের অধীন নিবন্ধিত কোন ক্লাবের সদস্যপদ থাকে;
১২. করদাতা যদি চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্হপতি অথবা সার্ভেয়ার হিসেবে বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসেবে কোন স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্হার নিবন্ধিত হন;
১৩. করদাতা যদি আয়কর পেশাজীবী (Income Tax Practitioner) হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিবন্ধিত হন;
১৪. করদাতা যদি কোন বণিক বা শিল্প বিষয়ক চেম্বার বা ব্যবসায়িক সংঘ বা সংস্হার সদস্য হন;
১৫. করদাতা যদি কোন পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কোন পদে বা সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হন;
১৬. করদাতা যদি কোন সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত সংস্হা বা কোন স্হানীয় সরকারের কোন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন;
১৭. করদাতা যদি কোন কোম্পানীর বা কোন গ্রুপ অব কোম্পানীজের পরিচালনা পর্ষদে থাকেন;
১৮. করদাতা যদি মটরযান, স্পেস/স্হান, বাসস্থান অথবা অন্যান্য সম্পদ সরবরাহের মাধ্যমে শেয়ারড ইকোনমিক এক্টিভিটিজে অংশগ্রহণ করেন;
১৯. করদাতা যদি লাইসেন্সধারী অস্ত্রের মালিক হন;
২০. সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে মোট বিনিয়োগ দুই লক্ষ টাকা অতিক্রম করলে;
২১. দুই লক্ষ টাকার অধিক পোস্টাল সঞ্চয় হিসাব খুলতে; এবং
২২. সমবায় সমিতির রেজিষ্ট্রেশনে।
রিটার্ন দাখিল করার ধারাঃ
আয়কর অধ্যাদেশে ১৯৮৪ এর ধারা ৭৫ রিটার্ন দাখিল সম্পর্কিত বিধান বর্ণিত রয়েছে।
(গ) যাদের জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয়ঃ
নিম্নোক্ত Person এর জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক (Mandatory) হবে না-
১. সরকারের Monthly Payment Order (MPO) এর অধীনে সুবিধা প্রাপ্ত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান;
২. কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়;
৩. কোন ফান্ড;
৪. কোন Class of Persons যাদেরকে অফিসিয়াল গেজেটে আদেশ জারীর মাধ্যমে রিটার্ন দাখিল থেকে বোর্ড অব্যাহতি প্রদান করেছে।
৫. বাংলাদেশে ফিক্সড বেজ নেই এমন অনিবাসীকে;
৬. জমি বিক্রয়ের জন্য ১২ ডিজিটের টিআইএন গ্রহণ করেছেন কিন্তু করযোগ্য আয় নেই;
৭. ক্রেডিট কার্ড গ্রহণের জন্য ১২ ডিজিটের টিআইএন গ্রহণ করেছেন কিন্তু করযোগ্য আয় নেই।
ঘ) রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি কয়টি ও কি কিঃ
বর্তমানে রিটার্ন দাখিলের জন্য ২টি পদ্ধতি প্রচলিত আছে।
যথাঃ
(১) সাধারণ পদ্ধতি; ও
(২) সর্বজনীন পদ্ধতি
(ঙ) আয়কর রিটার্নের সাথে কি কি বিবরণী ও তথ্য উপস্হাপন করতে হয়ঃ
আয়কর অধ্যাদেশের ৭৫ ধারার উপধারা (3) এর ক্লজ (a) তে বিধান করা হয়েছে যে আয়ের রিটার্নটি বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফরমে প্রযোজ্য সকল বিবরণ ও তথ্য সন্নিবেশ করে দাখিল করতে হবে। রিটার্নের সাথে প্রযোজ্য সকল তফসিল, বিবরণী, হিসাব, সংযোজনী ও দলিলাদিও দাখিল করতে হবে।
(চ) আয়কর রিটার্ন কি স্বাক্ষরযুক্ত হতে হয় এবং আয়কর রিটার্নে কে স্বাক্ষর করতে পারেনঃ
আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ৭৫ এর উপধারা (৩) (খ) অনুযায়ী-
(খ) প্রতিপাদিত এবং স্বাক্ষরযুক্ত হবে-
(i) ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে স্বয়ং ঐ ব্যক্তি কর্তৃক যেক্ষেত্রে ব্যক্তি বাংলাদেশে অনুপস্হিত সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির পক্ষে নিয়োজিত ও কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক এবং যেক্ষেত্রে এরুপ ব্যক্তি মানসিকভাবে তার স্বাভাবিক কাজ চালাতে অক্ষম সেক্ষেত্রে তার অভিভাবক কর্তৃক অথবা তার পক্ষে আইনতঃ কার্যক্ষম যে কোন ব্যক্তি কর্তৃক;
(ii) হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের ক্ষেত্রে কর্তা কর্তৃক এবং যেক্ষেত্রে কর্তা বাংলাদেশে অনুপস্হিত অথবা মানসিকভাবে তার স্বাভাবিক কাজ চালাতে অক্ষম সেক্ষেত্রে ঐ পরিবারের অন্য কোন প্রাপ্ত বয়স্ক সদস্য কর্তৃক;
(iii) কোম্পানী অথবা স্হানীয় কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে মূখ্য কর্মকর্তা কর্তৃক;
(iv) ফার্মের ক্ষেত্রে নাবালক ব্যতীত যে কোন অংশীদার কর্তৃক;
(v) কোন এসোসিয়েশনের ক্ষেত্রে, এসোসিয়েশনের যে কোন সদস্য অথবা মূখ্য কর্মকর্তা কর্তৃক; এবং
(iv) অন্য কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি কর্তৃক অথবা তার পক্ষে আইনত কাজ করতে সক্ষম ব্যক্তি কর্তৃক।
(ছ) করদাতার রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা কিঃ
কোম্পানীর ক্ষেত্রেঃ
পরবর্তী আয় বৎসরের ১৫ই জানুয়ারী তারিখের মধ্যে অথবা যেক্ষেত্রে আয় বৎসর শেষ হওয়ার ছয় মাসের পূর্বেই ১৫ই জুলাই আসে সেক্ষেত্রে ছয় মাস উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বেই রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
অন্যান্য করদাতার ক্ষেত্রেঃ
অন্য সকল ক্ষেত্রে পরবর্তী আয় বৎসরের নভেম্বর ৩০তম দিনে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
তবে শর্ত থাকে যে, একজন সরকারী কর্মকর্তা বিদেশে উচ্চ শিক্ষারত আছেন অথবা প্রত্যাবর্তনের অধিকারে বাংলাদেশের বাইরে কর্মরত আছেন, তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে ঐরুপ বিদেশে বা প্রত্যাবর্তনের অধিকার চর্চার মেয়াদ এর দলিল দাখিল করবেন।
(জ) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ কতঃ
কোন করদাতা আয়কর অধ্যাদেশের ৭৫ ধারা অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে তার উপর আয়কর অধ্যাদেশের ১২৪ ধারা অনুযায়ী জরিমানা-
করদাতা যদি ধারা-৭৫, ৭৭ ও ৮৯ (২), ৯১ (৩) বা ৯৩ (১) অনুযায়ী এবং অথবা ৭৫এ ধারার অধীনে উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহের জন্য যথাসময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করেন তাহা হইলে খেলাপী করদাতার সর্বশেষ আরোপিত আয়করের ১০% অথবা ১,০০০/- টাকা ও পরবর্তী প্রতি খেলাপী দিবসের জন্য ৫০/- টাকা, এ দুটির মধ্যে যেটি বেশী, উপ-কর কমিশনার কর্তৃক তাহা জরিমানা আরোপ করিতে পারেন।
৭৩ ধারা অনুযায়ী ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত সরল সুদ এবং ৭৩এ ধারা অনুযায়ী বিলম্ব সুদ (delay interest) আরোপযোগ্য হবে। যে ক্ষেত্রে করদাতা রিটার্ন দাখিলের জন্য সময়ের আবেদন করে উপ কর কমিশনার কর্তৃক মঞ্জুরকৃত বর্ধিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করবেন, সে ক্ষেত্রে করদাতার উপর জরিমানা আরোপিত হবে না, তবে অতিরিক্ত সরল সুদ ও বিলম্ব সুদ আরোপিত হবে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে কিছু সরকারি ও বেসরকারি সেবাগ্রহণে বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

  জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৩৯টি সেবার জন্য এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে, যার ফলে দেশের প্রত্যেক নাগরিককে নির্দিষ্ট কিছু সেবা পেতে আগে আয়কর...